ঈমান ও নামাজ
প্রত্যেকের প্রথমে ঈমানগ্রহণ আবশ্যক
মানুষ দুনিয়াতে সুখে শান্তিতে ও নিরাপদে বসবাস করুক আর আখিরাতে চিরস্থায়ী সৌভাগ্য অর্জন করুক এটিই মহান আল্লাহ্ তা'আলা চাইছেন। আর এজন্যই সৌভাগ্য অর্জনের পথকে সুগম করবে এমনকিছু করার জন্যই আদেশ দিয়েছেন এবং ধ্বংস ও অনিষ্টের কারণ হবে এমন ক্ষতিকর কিছু করতে নিষেধ করেছেন। মানুষের জন্য মহান আল্লাহ্ তা'আলার প্রথম আদেশ হলো ঈমান গ্রহণ কর। সমস্ত মানুষেরই ঈমান গ্রহণ করা আবশ্যক।
ঈমান-এর শাব্দিক অর্থ হলো,কাউকে সত্যবাদী হিসেবে জানা,তাকে বিশ্বাস করা। ইসলামের পরিভাষায় ঈমান হলো,মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পয়গম্বর আল্লাহর কর্তৃক নির্বাচিত ও প্রেরিত সংবাদদাতা তথা নবী, এব্যাপারে সঠিকভাবে জানা ও মনে প্রাণে বিশ্বাস করে মুখে বলা এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা সংক্ষেপে জানিয়েছেন তা সংক্ষেপে আর যা বিস্তারিত জানিয়েছেন তা বিস্তারিতভাবে জানা ও বিশ্বাস করা এবং মুখে সাধ্যানুযায়ী কালিমা-ই শাহাদাত বলা। শক্তিশালী ঈমান হলো,আগুন যে পোড়ায় আর সাপের বিষে যে মৃত্যু হয় তা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করার কারণে আগুন ও সাপ থেকে যেভাবে মানুষ পলায়ন করে ঠিক তেমনিভাবে মহান আল্লাহ্ তা'আলা ও তার সিফাত্-এর বিশালত্ব জেনে ও মনে প্রাণে বিশ্বাস করে তার সৌন্দর্যের প্রতি ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ছুটে যাওয়া আর তার পরাক্রমশীলতা ও গজব থেকে পলায়ন করা,মর্মর পাথরে খোঁদাই করে লিখার মত অন্তরে সুদৃঢ়ভাবে ঈমান স্থাপন করা।
ঈমান হলো হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক আনীত জীবন ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণরূপে মেনে নেয়া পছন্দ করা, ক্বলবের দ্বারা সত্যায়ন করা অর্থাৎ মনে প্রাণে বিশ্বাস করা। যারা তা বিশ্বাস করে তারাই মুমিন ও মুসলমান হিসেবে গণ্য হয়। প্রত্যেক মুসলমানই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারী হতে ও তার প্রদর্শিত পথে চলতে বাধ্য। তার পথ হলো পবিত্র কুরআনের প্রদর্শিত পথ। এই পথকেই ইসলামিয়্যাত বলা হয়। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথকে অনুসরণ করতে হলে প্রথমে ঈমান গ্রহণ করতে হবে,তারপরে ‘আহকামে ইসলামিয়্যা’কে অর্থাৎ মুসলমানিত্বকে ভালভাবে জানতে হবে,ফরজসমূহ পালন করতে হবে হারাম থেকে বেঁচে থাকতে হবে এরপরে পর্যায়ক্রমে সুন্নাতসমূহ পালন করতে হবে,মাকরুহ থেকে বিরত থাকতে হবে,সম্ভব হলে মুবাহ বা মুস্তাহাবও পালন করতে হবে।
আমাদের ধর্মের মূল ভিত্তি হলো ঈমান। যার ঈমান নাই তার কোন ইবাদত বা সৎকর্ম আল্লাহ্ তা'আলা পছন্দ করবেন না এবং কবুলও করবেন না। যে ব্যক্তি মুসলমান হতে চায় তার উচিত প্রথমে ঈমান গ্রহণ করা,তারপরে গোসল,অজু নামাজ ও পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ফরজ ও হারাম সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করা।
সহীহ ঈমান
ইন্দ্রিয়ের ও বিবেকের দ্বারা অর্জিত বিদ্যা আমাদের ঈমান গ্রহণের ক্ষেত্রে সহায়তা করে। বিজ্ঞান, বিশ্বজগতের শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয় আমাদের সামনে তুলে ধরে দেখিয়ে দেয় যে, এ সবকিছু কাকতালীয় হতে পারে না, অবশ্যই একজন স্রষ্টা রয়েছেন যার আদেশের অনুগত হয়ে এ জগত টিকে আছে। এভাবে বিজ্ঞান স্রষ্টাকে বুঝতে জানতে ও ঈমান গ্রহণের জন্যে সবব (কারণ) হয়। ঈমানের প্রকৃত অর্থ হলো,সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক মহান আল্লাহ্ তা'আলার কাছ থেকে আনা আদেশ- নিষেধ ও জীবন দর্শন সম্পর্কে শিখে তা বিশ্বাস করা। যে সব বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে তা যদি আকল তথা মানবিক বিচার-বিশ্লেষণের সাথে মিলে তবেই ঈমান আনব, এ কথা বলা পয়গম্বরদের প্রতি ঈমান না আনার শামিল। সত্য দ্বীনের মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়গুলি কোন বিদ্বান ব্যক্তির আবিষ্কার নয়। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বীনকে যেভাবে শিখিয়েছেন তা আহলে সুন্নাহমতাদর্শী আলেম'দের কিতাবসমূহ থেকে সঠিকভাবে জেনে সেভবে বিশ্বাস করা উচিত। সঠিক ও গ্রহণযোগ্য ঈমানের অধিকারী হতে হলে নিন্মোক্ত শর্তসমূহও মেনে চলা উচিত।
১. ঈমান তথা বিশ্বাস নিয়মিত স্থায়ী ও অবিচল হওয়া উচিত। এক মুহূর্তের জন্যও তা থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। কেউ যদি বলে,তিন বছর পর আমি ঈমান থেকে বের হয়ে যাব,তার ঈমান এ কথা বলার মুহূর্ত থেকেই ভঙ্গ হয়ে যায়। সে আর মুসলামান থাকে না।
২. মুমিনের বিশ্বাস, ভীতি ও আশার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখে। মহান আল্লাহর শাস্তির ভয়ে থরথর করে কাঁপে আবার আল্লাহ্ তায়ালার অসীম রহমত থেকেও একমুহূর্তের জন্য নিরাশ হয় না। ছোট বড় সব ধরনের গুনাহ থেকেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করা উচিত। গুনাহ এর কারণে যেন ঈমান নষ্ট না হয় সে জন্য সর্বদা ভীত থাকা উচিত। আবার সমস্ত গুনাহ করার পরও মহান আল্লাহ্ তা'আলা চাইলে ক্ষমা করতে পারেন। তাই তার রহমতের ব্যাপারেও নিরাশ হওয়া ঠিক নয়। কৃত গুনাহের জন্য সর্বদাই তওবা করা উচিত। কেননা যার তওবা কবুল হয় সে পুরোপুরি নিস্পাপ হয়ে যায়।
৩. রূহ কবজ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ মৃত্যুর সময়ে রূহ যখন গলা পর্যন্ত চলে আসে তার আগেই ঈমান গ্রহণ করা উচিত। কেননা রূহ যখন গলা পর্যন্ত চলে আসে তখন আখিরাতের সবকিছুই চোখের সামনে ভেসে উঠে। ঐ অবস্থায় কাফিররা ঈমান গ্রহণ করতে চাইবে। কিন্তু ঈমানতো গায়বি বিষয়ে হওয়া উচিত। না দেখে বিশ্বাস করার নামই ঈমান। অতএব, দৃশ্যমান কোন কিছুর উপর ঈমান আনা অবান্তর। জান কবজের আগ পর্যন্ত মুমিনের তওবা কবুল হয়।
৪. সূর্যের পশ্চিম দিক থেকে উদয়ের পূর্বেই ঈমান গ্রহণ করা উচিত। কিয়ামতের সবচেয়ে বড় আলামতসমূহের মধ্য থেকে একটি হলো,সূর্যের পশ্চিম দিক দিয়ে উদয় হওয়া। যখন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদয় হবে তখন সমস্ত মানুষ তা দেখে ঈমান গ্রহণ করবে। কিন্তু এই ঈমান গ্রহণ করা হবে না। কেননা তখন তওবার দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে।
৫. মহান আল্লাহ্ তায়ালা ব্যতীত আর কেউই গায়েব তথা অদৃশ্য জগত সম্পর্কে কোন জ্ঞান রাখে না,এটা বিশ্বাস করা। অর্থাৎ গায়েব কেবলমাত্র আল্লাহ্ তায়ালা জানেন। তিনি বিশেষ অনুগ্রহ করে যদি কাউকে গায়েবের বিষয়ে জানান তবেই সে জানতে পারে। ফেরেশতা,জ্বিন শয়তান এমনকি পয়গম্বররাও নিজ থেকে গায়েব জানতে পারে না। মহান আল্লাহ্ তায়ালা তার প্রেরিত নবী-রাসূলদের ও সালিহ বান্দাদের কখনো কখনো গায়েবের বিষয়ে জানিয়ে থাকেন।
৬. ঈমান ও ইবাদতের সাথে সম্পর্কিত দ্বীনী হুকুমসমূহের কোনটি, কোন ধরনের জারুরাত কিংবা উজর না থাকলে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করা উচিত নয়। আহকামে ইসলামিয়া অর্থাৎ ইসলামের আদেশ ও নিষেধসমূহের কোনটিকে হালকা ভাবে নেয়া,পবিত্র কুরআনকে অবজ্ঞা করা, ফেরেশতা ও নবীগণদের থেকে একজনকে নিয়েও উপহাস করা এবং তাদের মাধ্যমে যে আদর্শ ও বিশ্বাস শিক্ষা দেয়া হয়েছে তা কোনধরনের বাধ্যবাধকতা না থাকা স্বত্বেও মৌখিকভাবে অস্বীকার করা কুফুরীর শামিল। তবে আল্লাহ্ তা'আলার একত্ববাদ,ফেরেশতাদের অস্তিত্ব নামাজ ও গোসলের ফরজ হওয়া ইত্যাদির মত বিষয় যদি মৃত্যুর হুমকি থেকে বাঁচার জন্য মৌখিকভাবে অস্বীকার করে সেক্ষেত্রে ব্যক্তি কাফির হয় না। কেননা মৃত্যুর হুমকি থেকে বাঁচার চেষ্টা,জারুরাত হিসেবে বিবেচিত হয়।
৭. ইসলাম ধর্মের প্রয়োজনীয় যেসব বিষয়ে শরীয়ত কর্তৃক স্পষ্ট বিধান দেয়া হয়েছে সেসব বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করা কিংবা দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগা উচিত নয়। নামাজ আদায় করা ফরজ,মদ ও অ্যালকোহলো জাতীয় পানীয় পান করা, জুয়া খেলা,সুদ ও ঘুষ খাওয়া ইত্যাদি শরীয়তে হারাম করা হয়েছে। এগুলো নিয়ে সন্দেহ পোষণ করলে অথবা এর মত প্রসিদ্ধ কোন হারামকে হালাল হিসেবে কিংবা প্রসিদ্ধ কোন হালালকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করলে ঈমান ভঙ্গ হয়ে যায়।
৮.ঈমান,ইসলাম ধর্ম যেভাবে শিখিয়েছে সেভাবেই হওয়া উচিত। নিজ বিচার বিশ্লেষণ ও বুঝ অনুযায়ী দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের মতানুযায়ী বিশ্বাস করলে তা ঈমান হবে না। আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে শিখিয়েছেন ঠিক সেভাবেই ঈমান তথা বিশ্বাস করতে হবে
৯.ঈমান গ্রহণকারী ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই কাউকে ভালবাসবে কিংবা কারো সাথে শত্রুতা পোষণ করবে। তার উচিত,আল্লাহর প্রিয় দোস্ত তথা মুসলমানদেরকে ভালোবাসা এবং হাত কলম ইত্যাদি বিভিন্ন উপায়ে যারা ইসলামের বিরোধিতা করে তাদেরকে অপছন্দ করা,তাদের বিরুদ্ধে মনে মনে শত্রুতা পোষণ করা।
তবে একটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে সাধারন অমুসলিম নাগরিক ও পর্যটকদের সাথে সর্বদা নম্র ও আন্তরিক ব্যবহার করা উচিত। তাদের সাথে মিষ্টিভাষী হওয়া উচিত। আমাদের সুন্দর আখলাকের দ্বারা তাদের মন জয় করার চেষ্টা করা উচিত যাতে তাদের হৃদয়ে আমাদের ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে ভাল ধারনা জন্মে৷৷
১০. প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবীদের প্রদর্শিত সঠিক পথ থেকে সামান্যতম বিচ্যুত না হয়ে, প্রকৃত মুসলমানেরা যেভাবে ঈমানকে গ্রহণ করেছে ঠিক তেমন ঈমান গ্রহণ করা উচিত। সত্যিকার অর্থেই মুমিন হতে হলে, আহলে সুন্নাহওয়াল জামাতের ই'তিক্বাদ অনুযায়ী ঈমান গ্রহণ করা জরুরী। আহলে সুন্নাহ মতাদর্শের অনুসারী আলেম দের কর্তৃক রচিত প্রকৃত দ্বীনী কিতাবসমূহের অনুসারীদের একশত শহীদের সমতুল্য সওয়াব দেয়া হবে। চার মাজহাবের প্রত্যেকটির অনুসারী আলেম দেরকে আহলে সুন্নাহ মতাদর্শের আলেম হিসেবে গণ্য করা হয়। আহলে সুন্নাতের অনুসারী আলেমদের প্রধান হলেন,ইমাম আযম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি। এই আলেমগণ রাসূলের সম্মানিত সাহাবীদের কাছ থেকে ইসলামকে শিখে লিপিবদ্ধ করেছিলেন আর সাহাবীগণ ইসলামকে সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে দেখে শুনে শিখেছেন ও পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
